আন্তর্জাতিক

'ট্রাম্পের অভিবাসন কড়াকড়িতে চিকিৎসক সংকট, হুমকিতে মার্কিন স্বাস্থ্যখাত'- গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন

15820_NewsLabAsiaPost8e8ac43b-a056-42b6-91fb-d41e2539651c.jpg

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় ক্যানসারের হার বেশি আর গড় আয়ু অনেক কম। সেখানকার চিকিৎসকরা বলছেন, এই অঙ্গরাজ্যে আলীর মতো ডাক্তারই এখন খুব প্রয়োজন। আফগানিস্তান থেকে আলী ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। তিনি এমন একটি ভিসায় কাজ করছেন, যার শর্ত হলো, তাকে এমন এলাকায় সেবা দিতে হবে যেখানে চিকিৎসকের অভাব রয়েছে।

ত্রিশের কোঠায় থাকা আলী ভবিষ্যতে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হতে চান। নিজের নতুন দেশে ক্যানসার ও অন্যান্য জটিল রোগের চিকিৎসা করাই তার স্বপ্ন। এখানকার উঁচু-নিচু পাহাড়গুলো দেখে তার দেশের গ্রামীণ জনপদের কথা মনে পড়ে। বর্তমানে তিনি একটি কয়লাখনি অঞ্চলের বড় হাসপাতালে রোগীদের সেবা দিচ্ছেন।

গত বছর তিনি ১ হাজার ৬০০-এর বেশি রোগীর চিকিৎসা করেছেন। তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশেরও বেশি রোগী সরকারি স্বাস্থ্যবীমা প্রকল্পের (মেডিকেয়ার ও মেডিকেইড) আওতাভুক্ত। এখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক খুব কম। তাই অনেক রোগীকে আলীর কাছে আসতে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে হয়।

নিরাপত্তার স্বার্থে ‘আলী’ নামটি ছদ্মনাম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তার সঠিক অবস্থানও গোপন রাখা হয়েছে। তিনি নিয়মিত লিভারের রোগী ও ডায়াবেটিসজনিত নানা জটিলতার চিকিৎসা করেন। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় এই স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো অনেক বেশি প্রকট।

আলীর এক জ্যেষ্ঠ সহকর্মী বলেন, ‘তিনি একজন অসাধারণ সেবাদাতা। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার মানুষের যত্ন নেওয়ার জন্য তার যথেষ্ট জ্ঞান ও সক্ষমতা রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, আলী এখানকার মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন।

তবে আলীর যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করা এখন অনিশ্চিত। তিনি গ্রিন কার্ডের আবেদন করেছেন; কিন্তু এখনো অনুমোদন পাননি। গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন ৩৯টি দেশের নাগরিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে, যার মধ্যে আফগানিস্তানও রয়েছে। প্রশাসন বলছে, ওই সব দেশে নিরাপত্তা ও পরিচয়পত্র যাচাইয়ের সঠিক ব্যবস্থা নেই।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রশাসন আরও একটি নতুন নিয়ম করে। যারা ওই ৩৯টি দেশের নাগরিক এবং এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে আছেন, তাদের গ্রিন কার্ড ও অন্যান্য সুবিধার আবেদনও এখন স্থগিত রাখা হয়েছে।

হঠাৎ করেই আলীর পুরো জীবিকা এখন হুমকির মুখে। সাধারণত গ্রিন কার্ডের আবেদন জমা দিলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে থাকা যায়। কিন্তু আলীর বর্তমান ভিসার মেয়াদ এই শরতেই শেষ হয়ে যাবে।

সরকার যদি গ্রিন কার্ড অনুমোদন না করে বা আলীর ভিসার মেয়াদ না বাড়ায়, তবে তিনি চাকরি হারাবেন। আলীর দুই সন্তান যুক্তরাষ্ট্রে জন্মেছে এবং তারা আইনত এ দেশের নাগরিক। তবুও আলীর জীবন এখন চরম অনিশ্চয়তায়।

মার্কিন সরকারের অভিবাসন বিভাগ (ইউএসসিআইএস) বর্তমানে দেশটিতে থাকা অভিবাসীদের গ্রিন কার্ড বা অন্যান্য আবেদনের প্রক্রিয়া স্থগিত রেখেছে। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে বেশ কিছু মামলা হয়েছে। সম্প্রতি একটি বড় মামলায় আদালত সরকারকে আবেদন প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে। এতে পুরো বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের একটি প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল অবৈধ অভিবাসীদের গণবহিষ্কার। তবে পর্দার আড়ালে বৈধভাবে থাকা ব্যক্তিদের আইনি মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার একটি চেষ্টাও চলছে। এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা খাতের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন দরিদ্র ও অসহায় রোগীরা।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হাসপাতালগুলোতে সরাসরি রোগী সেবায় নিয়োজিত প্রতি ছয়জন কর্মীর মধ্যে একজন অভিবাসী। এ ছাড়া প্রায় ৪ শতাংশ হাসপাতাল কর্মী এখনো দেশটির নাগরিকত্ব পাননি। ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিগুলো এই ভঙ্গুর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘকাল ধরেই প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক নিয়োগ দিতে হিমশিম খাচ্ছে। আমেরিকান মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রতি চারজন ডাক্তারের মধ্যে একজন বিদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। মার্কিন চিকিৎসকেরা সাধারণত গ্রামীণ এলাকায় যেতে চান না। তাই গ্রামীণ হাসপাতালগুলো বিদেশি চিকিৎসকদের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। আলী এবং তার মতো বিদেশি চিকিৎসকেরা এই সংকটের সমাধান হয়ে কাজ করছেন।

আমেরিকান কলেজ অব ফিজিশিয়ানসের প্রেসিডেন্ট ড. জ্যান কার্নি এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘অভিবাসন নীতির বারবার পরিবর্তন আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকার মানুষের সুস্বাস্থ্যের জন্য এই চিকিৎসকেরা অত্যন্ত অপরিহার্য।’

যুদ্ধময় এক শৈশব

ডাক্তার আলীর দিন শুরু হয় খুব ভোরে। ভোর সাড়ে পাঁচটায় তিনি পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ৩৫ মিনিটের পথ গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে পৌঁছান। সেখানে পৌঁছে কফি আর হাতে তৈরি স্যান্ডউইচ খেতে খেতেই তিনি রোগীদের রিপোর্ট দেখতে শুরু করেন। আলী তার অধীনে থাকা তিনজন চিকিৎসকের (রেসিডেন্ট) কাজের তদারকি করেন। তিনি জানান, তার রোগীরা খুবই জটিল সমস্যায় ভোগেন। অনেকের লিভারের সমস্যার পাশাপাশি হৃদরোগও থাকে।

সারাদিনই তিনি রোগীদের সেবায় ব্যস্ত থাকেন। আলী কখন বাড়ি ফিরবেন, তা আগে থেকে বলা কঠিন। তবে ঘুমানোর আগে তিনি তার দুই সন্তানের সঙ্গে খেলা করার চেষ্টা করেন। বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়লে আলী পড়াশোনা ও গবেষণাপত্র লেখেন। তিনি একটি মেডিকেল ফেলোশিপের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যা বর্তমানে তার অভিবাসন আবেদনের কারণে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। রাতে ঘুমানোর আগে তিনি আফগানিস্তানে তার বাবা ও বোনদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলেন।

আলীর জন্ম আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের উত্তরের একটি ছোট গ্রামে। তিনি বলেন, ‘আমার পুরো শৈশবটাই ছিল যুদ্ধময়।’ প্রথমে আফগান গৃহযুদ্ধ এবং পরে মার্কিন আগ্রাসন, সবই তিনি দেখেছেন। তিনি আরও বলেন, ‘তালেবান আমলে কোনো হাসপাতালেই ঠিকমতো চিকিৎসা চলত না। তখন ডাক্তাররা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন।’

আলীর বাবা ছিলেন তাদের গ্রামের একমাত্র চিকিৎসক। অতীতের স্মৃতি হাতড়ে আলী বলেন, ‘সাধারণ সংক্রমণেও তখন শিশুরা মারা যেত। আমার বাবা সাধ্যমতো চেষ্টা করতেন, কিন্তু প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তার ছিল না।’

ছোটবেলায় আলীর এক চোখে ছানি পড়েছিল। তখন তালেবান শাসিত কাবুলে কোনো চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ছিল না। অগত্যা তার বাবা তাকে চিকিৎসার জন্য পাকিস্তানে নিয়ে যান। সেই অভিজ্ঞতাই আলীকে চিকিৎসক হওয়ার পথে অনুপ্রাণিত করেছিল। পরে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানদের জন্য বরাদ্দ এক আন্তর্জাতিক বৃত্তির সহায়তায় তিনি মধ্যপ্রাচ্যের একটি মেডিকেল কলেজে পড়ার সুযোগ পান।

আলী ২০০৯ সালে প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে আসেন পেনসিলভানিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কর্মসূচিতে যোগ দিতে। সেখানে তিনি এমন একটি ওষুধ নিয়ে কাজ করেন, যা পরে মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) অনুমোদন পায়। ২০১৩ সালে তিনি মধ্য-পশ্চিমের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যানসার জেনেটিকস নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।

২০২০ সালে করোনা মহামারির চূড়ান্ত সংকটের সময় তিনি উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের জন্য বরাদ্দ এইচ-১বি ভিসা পান। তখন তিনি ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার একটি গ্রামীণ হাসপাতালে যোগ দেন। পরে তিনি বড় একটি হাসপাতালে বদলি হন, যেখানে তিনি বর্তমানে কর্মরত।

যুক্তরাষ্ট্রের গ্রামীণ জনপদে আলীর এই যাত্রা বিদেশি চিকিৎসকদের জন্য খুব পরিচিত এক গল্প। অনেক বিদেশি চিকিৎসকই এমন এক কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে আসেন, যেখানে তাদের অন্তত তিন বছর চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত এলাকায় কাজ করতে হয়।

এর বিনিময়ে তারা দেশটিতে থাকার সুযোগ পান। ডক্টর কার্নি বলেন, অনেকে এরপর আর শহরমুখী হন না। মার্কিন চিকিৎসকদের তুলনায় বিদেশি মেডিকেল গ্র্যাজুয়েটরাই গ্রামীণ এলাকায় সেবা দিতে বেশি আগ্রহী হন।

আলীর মতো অনেক বিদেশি চিকিৎসকেরই যুক্তরাষ্ট্রে তেমন কোনো চেনা-জানা ছিল না। তবে সময়ের সঙ্গে তারা স্থানীয়দের আপন হয়ে উঠেছেন। আলী তার স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় বেশ সুখেই থিতু হয়েছিলেন। গত মে মাসের শেষের দিকে তারা তাদের ছয় বছর বয়সী ছেলের স্কুল সমাপনী অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন।

স্কুলের সাজানো জিমনেসিয়ামে সহপাঠীদের সঙ্গে নাচে অংশ নিয়েছিল আলীর ছেলে। আলী পেছন থেকে সেই দৃশ্য ভিডিও করছিলেন। পাশেই তার স্ত্রী দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাদের কোলে ছিল ছোট্ট মেয়েটি, যার গায়ে ছিল মিকি মাউসের টি-শার্ট। বড় বড় চোখে সে অবাক হয়ে ভাইয়ের কাণ্ড দেখছিল।

অনুষ্ঠান শেষে স্পাইডার-ম্যানের ব্যাগ কাঁধে ছেলেটি দৌড়ে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে। আলীর দুই সন্তানই শুধু ইংরেজিতে কথা বলতে পারে। আলীর স্ত্রী বলেন, ‘ওরা জানেই না যে ওরা অন্যদের চেয়ে আলাদা। শিশুদের এটাই সৌন্দর্য।’

অনুষ্ঠানের পর এক শিক্ষক এসে আলীকে জিজ্ঞেস করেন, তার ছেলে আগামী বছর স্কুলে ভর্তি হবে কি না। আলী কোনো উত্তর দিতে পারেননি। কারণ আগামী সেপ্টেম্বরেই হয়তো তাদের এই এলাকা ছাড়তে হবে। কপাল ভালো হলে হয়তো আলীর ফেলোশিপের জন্য তারা কর্মস্থলের কাছেই অন্য কোথাও থাকবেন। আর তা না হলে হয়তো তাদের দেশই ছাড়তে হতে পারে।

কিন্তু যাবেন কোথায়?

আলীর ভয়, আফগানিস্তানে ফিরলে তালেবানরা তাকে মেরে ফেলবে। কারণ তিনি এমন এক জাতিগোষ্ঠীর মানুষ যারা তালেবানবিরোধী এবং তিনি আফগানিস্তানে থাকাকালীন মার্কিন বাহিনীর হয়ে কাজ করেছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসকের ঘাটতি মেটাচ্ছেন এই বিদেশি ডাক্তাররাই। আলীর কাছে চিকিৎসা নিতে অনেক রোগীকে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার দুর্গম এলাকা থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসতে হয়। যেমন ম্যাকডুয়েল কাউন্টির সরু আঁকাবাঁকা পথগুলো অ্যাপালাচিয়ান পাহাড়ের ভেতর দিয়ে মাইলের পর মাইল চলে গেছে।

কোথাও কোথাও রাস্তার ওপর গাছের ডালপালা এমনভাবে ঝুলে আছে যে মনে হয় সেটি যেন এক সবুজ ছাদ। বনের মাঝে মাঝে চোখে পড়ে পড়ে থাকা ট্রেনের ধ্বংসাবশেষ, মরচে ধরা স্কুল বাস কিংবা জরাজীর্ণ সব ঘরবাড়ি। এই কাউন্টিটি অঙ্গরাজ্যের অন্যতম দরিদ্র এলাকা।

এখানকার অনেক শহরে গত দুই বছর ধরে পানের যোগ্য নিরাপদ পানির কোনো ব্যবস্থা নেই। ম্যাকডুয়েল কাউন্টির একটি সরাইখানার বারটেন্ডার হেভেন ওয়ালশ বলেন, ‘এখানে অনেক দারিদ্র্য।’ তার পেছনেই দেখা যায় গ্রাহকদের আনাগোনা। কেউ কয়লাখনি থেকে কাজ সেরে ফিরছেন, কেউবা ঘুরতে এসেছেন।

ওয়ালশ বলেন, ‘এখানে শুধু কয়লাখনি বা হাসপাতালে চাকরি আছে। আর কেউ যদি এখান থেকে চলে যেতে চায়, সে সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়।’ আফগানিস্তানের যুদ্ধ থেকে বাঁচতে আলী এসেছিলেন ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায়। আর ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর এই ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার অনেক মানুষ আফগানিস্তানে যুদ্ধ করতে গিয়েছিলেন। এটি এক অদ্ভুত ও বিষাদময় সংযোগ।

১৯৪০-এর দশকে ম্যাকডুয়েল কাউন্টিতে ১ লাখের বেশি মানুষ ছিল। এখানকার ওয়েলচ-এর মতো শহরগুলো তখন এতই সমৃদ্ধ ছিল যে একে ‘লিটল নিউইয়র্ক’ বলা হতো। আজ সেই কাউন্টিতে ১৭ হাজার মানুষও নেই। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার অনেক গ্রাম এখন জনশূন্য হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে অসুস্থ মানুষের সংখ্যা।

পুরো যুক্তরাষ্ট্রে ক্যানসারে মৃত্যুর হারের দিক থেকে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার অবস্থান দ্বিতীয়। এখানকার প্রতি আটজন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজন ক্যানসারজয়ী। যুক্তরাষ্ট্রে গড় আয়ু সবচেয়ে কম এমন রাজ্যগুলোর একটি এটি।

ছোট শহরগুলোতে ডাক্তার পাওয়া এখন অনেক কঠিন। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া হাসপাতাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট জিম কফম্যান বলেন, গ্রামীণ এলাকার অনেক হাসপাতালে মাত্র একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার থাকেন। তিনি জানান, একটি হাসপাতাল চার বছর ধরে একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ খুঁজছে। কিন্তু কাউকেই পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত ডাক্তার না পেয়ে হাসপাতালটির প্রসূতি সেবা বিভাগই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার গ্রামীণ এলাকায় হাসপাতাল খুব কম। ডক্টর এপ্রিল ভেস্টাল বলেন, এখানকার ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ ‘হেলথকেয়ার ডেজার্ট’ বা স্বাস্থ্যসেবা মরুভূমিতে বাস করেন। অর্থাৎ তাদের হাতের নাগালে কোনো ডাক্তার বা ফার্মেসি নেই। ডক্টর ভেস্টাল এই সমস্যা মেটাতে শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুবিধা, ভ্রাম্যমাণ ক্যানসার স্ক্রিনিং ইউনিট এবং এমনকি হেলিকপ্টার সেবার মতো বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবছেন।

তবে আলীর মতো বিদেশি চিকিৎসকেরাই এখনো এই সংকটের প্রধান সমাধান। শিশু বিশেষজ্ঞ ডক্টর কেট ওয়ালডেক জানান, তিনি একবার একজন বিদেশি ডাক্তারের জায়গায় কাজ করেছিলেন। ওই ক্লিনিকে তিনিই ছিলেন একমাত্র শিশু বিশেষজ্ঞ। ওই ডাক্তার বছরে ৫০ সপ্তাহ কাজ করতেন। ওয়ালডেক বলেন, তিনি যাতে মাত্র এক সপ্তাহ ছুটি কাটাতে পারেন, সেজন্য আমাকে সেখানে পাঠানো হয়েছিল।

ডক্টর ওয়ালডেক আরও জানান, অন্য এক জায়গায় তার এক সহকর্মীর বয়স ষাটের কোঠায় এবং তিনি সিরিয়া থেকে এসেছেন। গ্রামীণ আমেরিকার এই চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো মূলত বিদেশি ডাক্তারদের ওপরই টিকে আছে।

ডাক্তার হারানোর ঝুঁকিতে যুক্তরাষ্ট্রের হাসপাতাল

ট্রাম্প প্রশাসনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণের পেছনে আলীর জন্মভূমি আফগানিস্তানের একটি ঘটনা বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ওয়াশিংটন ডিসিতে ন্যাশনাল গার্ডের দুই সদস্যকে গুলি করা হয়।

ওই ঘটনায় এক আফগান নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। হামলার পর এক ভাষণে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘যাদের আমাদের দেশে থাকারই কথা নয়, তাদের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলার ওপর এমন আক্রমণ আমরা সহ্য করব না।’

এই ঘটনা আলীকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত সেই গার্ডদের একজন ছিলেন ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার। ফলে এখানকার আফগান কমিউনিটির সবাই খুব আতঙ্কে ছিলেন।’ আলীর স্ত্রী ভয়ে টানা এক মাস ঘর থেকেই বের হননি।

যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি চিকিৎসকদের আসতে সহায়তা করে ‘ইনথেলথ’ নামের একটি সংস্থা। তারা জানায়, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া নাইজেরিয়া ও ইরানের মতো দেশগুলো মার্কিন হাসপাতালগুলোর পছন্দের তালিকার শীর্ষে ছিল। অর্থাৎ এসব দেশ থেকেই সবচেয়ে বেশি ডাক্তার আসত।

গত জানুয়ারিতে সরকার ওই সব দেশের নাগরিকদের সব ধরনের অভিবাসন আবেদন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। মার্কিন অভিবাসন বিভাগ (ইউএসসিআইএস) জানায়, সর্বোচ্চ স্তরের নিরাপত্তা যাচাই নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে বছরের পর বছর ধরে বৈধভাবে কাজ করা চিকিৎসকেরাও এখন বেকার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন।

আলীর চাকরি এখন সুতায় ঝুলছে। এই নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত আলীসহ আরও অনেকে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (এএমএ) এবং আমেরিকান কলেজ অব ফিজিশিয়ানস (এসিপি) চিকিৎসকদের এই নিয়মের আওতামুক্ত রাখার অনুরোধ জানিয়ে ইউএসসিআইএস-কে চিঠি দিয়েছে। চিকিৎসকেরা এখন ফেডারেল আদালতের মাধ্যমে প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের মোকাবিলা করছেন।

সরকার পরে তাদের ওয়েবসাইটে জানায় যে, অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনার পর ‘চিকিৎসক’সহ কয়েকটি শ্রেণির মানুষের ওপর থেকে স্থগিতাদেশ তুলে নেওয়া হয়েছে।

মার্কিন অভিবাসন বিভাগ (ইউএসসিআইএস) ‘দ্য গার্ডিয়ান’কে জানিয়েছে, তারা ডাক্তারদের কিছু আবেদন প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তবে ঝুলে থাকা মামলাগুলো কবে নাগাদ নিষ্পত্তি হবে, সে বিষয়ে তারা স্পষ্ট করে কিছু বলেনি।

কয়েক দিন আগে একটি ফেডারেল আদালত রায় দিয়েছেন যে ৩৯টি দেশের নাগরিকদের অভিবাসন সুবিধা বন্ধ রাখতে পারবে না ইউএসসিআইএস।

আদালত বলেন, এই নীতিতে ‘অভিবাসী-বিদ্বেষ’ প্রকাশ পেয়েছে, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনোভাবেই প্রভাব ফেলতে দেওয়া যাবে না। ইউএসসিআইএস এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলেও আপাতত আদালতের নির্দেশ মেনে চলার কথা জানিয়েছে।

আদালতের রায়ের বিষয়ে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির (ডিএইচএস) জেনারেল কাউন্সিল জেমস পার্সিভাল একটি ই-মেইল বার্তায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘বামপন্থিরা’ বর্ণবাদী বিদ্বেষের অজুহাত তুলে ট্রাম্প আমলের প্রায় প্রতিটি নীতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। তিনি একে ‘আইনি পোশাকে অন্তর্ঘাত’ হিসেবে অভিহিত করেন।

তবে এই রায়ের পর সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মামলাগুলোর ভবিষ্যত কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। আলীর আইনজীবী কার্টিস মরিসন বলেন, ইউএসসিআইএস কেবল তাদেরই আবেদন প্রক্রিয়া করছে যারা আদালতে মামলা করেছে। তার আশঙ্কা, সংস্থাটি আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নে ইচ্ছাকৃতভাবে গড়িমসি বা ধীরগতি অবলম্বন করছে।

‘দ্য গার্ডিয়ান’ এই প্রতিবেদনের জন্য ২১ জন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের মধ্যে মাত্র একজনের আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আলীসহ বাকি ২০ জনই এখনো অপেক্ষার প্রহর গুনছেন।

এই অনিশ্চয়তা আলীর হাসপাতালের মতো আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের চরম সংকটে ফেলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবায় আমাদের সবসময় পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। আমরা চেষ্টা করছি, কিন্তু পরিস্থিতি দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।’

অভিবাসন নীতির অন্যান্য পরিবর্তনও হাসপাতালগুলোর সংকট বাড়িয়ে দিচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন বিদেশ থেকে এইচ-১বি ভিসার আবেদনের ফি ২ থেকে ৫ হাজার ডলার থেকে বাড়িয়ে একলাফে ১ লাখ ডলার করেছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, তারা মরিয়া হয়ে একজন চিকিৎসকের জন্য এই ১ লাখ ডলার ফি জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া চালাচ্ছেন। এর প্রভাব এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘ডাক্তার সংকটের কারণে গত বছর যেখানে আমরা ১৫০টি কিডনি প্রতিস্থাপন করতে পেরেছিলাম, এবার সেখানে হয়তো মাত্র ৮০টি করতে পারব। অর্থাৎ ৭০ জন মানুষ চলতি বছর নতুন কিডনি পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।’

গত ৮ জুন অন্য এক ফেডারেল বিচারক ১ লাখ ডলারের ওই বর্ধিত ভিসা ফি বাতিলের নির্দেশ দেন। তবে সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধেও আপিল করেছে।

‘বিনামূল্যে সেবা দেওয়ার অনুমতি নেই’

ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া একটি বড় উদাহরণ হলেও পুরো যুক্তরাষ্ট্রেই এখন এমন পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এই প্রতিবেদনের জন্য সাক্ষাৎকার দেওয়া সব চিকিৎসকই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া দেশগুলোর নাগরিক। তারা সবাই এমন সব গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করছেন যেখানে চিকিৎসকের চরম সংকট রয়েছে। বর্তমানে তারা সবাই যুক্তরাষ্ট্রে তাদের ভবিষ্যত নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় আছেন।

সুদানি বংশোদ্ভূত এক হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আমি কোভিডের সময় সামনের সারিতে থেকে লড়াই করেছি। ছয় বছর ধরে প্রবীণ সেনাদের সেবা দিয়েছি। অথচ কেবল আমার জন্মস্থানের কারণে আজ আমি এই অবস্থায়।’ তার স্ত্রী একজন শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ। তারা এখন তাদের দ্বিতীয় সন্তানের অপেক্ষায় আছেন।

স্বামী বলেন, ‘চাকরি না থাকলে আমাদের কোনো স্বাস্থ্যবীমাও থাকবে না। এই নাজুক সময়ে আমার স্ত্রী চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।’ দ্রুত আবেদন মঞ্জুর না হলে ওই নারী চিকিৎসকও তার চাকরি হারাবেন। উল্লেখ্য, যে হাসপাতালটি তাকে নিয়োগ দিয়েছিল, তারা চার বছর ধরে একজন বিশেষজ্ঞ খুঁজছিল।

৩৮ বছর বয়সী লিবিয়ান চিকিৎসক ফয়সাল আল ঘৌলা ইন্ডিয়ানার একটি সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় ফুসফুস ও আইসিইউ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছেন। তিনিও অনিশ্চয়তার মুখে। ফয়সাল বলেন, ‘আমার হাসপাতাল অনেক দিন ধরে লোক খোঁজার চেষ্টা করছে কিন্তু কাউকে পাচ্ছে না।’ তিনি চলে গেলে নতুন ডাক্তার খুঁজে পাওয়া এবং তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হাসপাতালের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

আরেকজন সুদানি চিকিৎসক একটি কারাগারে কাজ করতেন। তার কাজের অনুমতিপত্র (ওয়ার্ক পারমিট) ঝুলে থাকায় চলতি বছর তাকে কাজ বন্ধ করতে হয়েছে। কারাগারে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি একটি দাতব্য ক্লিনিকে বিনামূল্যে রোগীদের সেবা দিতেন। কিন্তু আইনি জটিলতায় এখন সেখানে কাজ করার অনুমতিও তার নেই।

তিনি বলেন, ‘বিনা পয়সায় সেবামূলক কাজ করতেও আমাকে বাধা দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি সত্যিই হৃদয়বিদারক।’

সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় তিনি দিনভর তার ৩৬ জন রোগীকে ফোন করে নতুন ডাক্তার খুঁজে নিতে বলছিলেন। তাদের মধ্যে অনেকের অবস্থাই বেশ গুরুতর। সাতজন রোগী তাকে ফোন করে জানিয়েছেন যে, তারা সময়মতো অন্য কোনো ডাক্তার খুঁজে পাচ্ছেন না।

ডাক্তার আলীও গত কয়েক বছর ধরে যাদের সেবা দিচ্ছেন, তাদের নিয়ে চিন্তিত। নিজের পরিবার ও ভবিষ্যত নিয়েও তার শঙ্কার শেষ নেই। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে সবকিছু নিয়ম মেনে করার পরও আজ আমি এই অচলাবস্থায় এসে পড়েছি।’

সর্বাধিক পঠিত


ভিডিও