
গত বছর রুশ বাহিনীকে চীনের দেওয়া গোপন সামরিক প্রশিক্ষণে ব্যক্তিগতভাবে অনুমোদন দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী। ইউরোপের দুজন কর্মকর্তা ও রয়টার্সের হাতে আসা কিছু নথি থেকে এ তথ্য জানা গেছে। এই প্রক্রিয়ায় রাশিয়া ও চীনের অন্তত চারজন জেনারেল সরাসরি যুক্ত ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ইউক্রেন যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত এই প্রশিক্ষণে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা রাশিয়া ও চীনের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতারই বহিঃপ্রকাশ। বেইজিং এ ধরনের প্রশিক্ষণের কথা অস্বীকার করলেও বিষয়টি ইউরোপজুড়ে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
রয়টার্সের দেখা রাশিয়ার একটি অতি গোপনীয় নথিতে ২০২৫ সালের আগস্টে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই বেলোসভের জারি করা একটি অভ্যন্তরীণ ডিক্রির সরাসরি উল্লেখ রয়েছে।
নথিতে বলা হয়, বেলোসভের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রুশ সশস্ত্র বাহিনীর একটি প্রতিনিধিদল চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) স্থাপনায় সামরিক মহড়ায় অংশ নিতে চীন সফর করেছিল।
তেজস্ক্রিয়, জৈবিক ও রাসায়নিক যুদ্ধবিষয়ক প্রশিক্ষণ
ওই প্রতিবেদনে একটি প্রশিক্ষণ কোর্সের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে। গত নভেম্বরে বেইজিংয়ের একটি সামরিক স্থাপনায় তিন সপ্তাহব্যাপী এই প্রশিক্ষণটি মূলত তেজস্ক্রিয়তা, রাসায়নিক ও জৈবিক সুরক্ষা বিষয়ক ছিল।
প্রতিবেদনগুলোতে কিছু ছবিও দেখা গেছে, যেখানে চীনা প্রশিক্ষক রুশ সেনাদের পাঠ দিচ্ছেন। এছাড়া রুশ সেনারা একটি পরমাণু রিয়াক্টরের মডেল পর্যবেক্ষণ করছেন এবং তাদের ‘রাসায়নিক ও তেজস্ক্রিয়তা শনাক্তকরণ’ ও ভবনের বায়ু চলাচল ব্যবস্থা দূষণমুক্ত রাখার উপায় শেখানো হচ্ছে।
ইউরোপীয় এক কর্মকর্তা বলেন, তেজস্ক্রিয়, জৈবিক ও রাসায়নিক যুদ্ধবিষয়ক প্রশিক্ষণের অন্তর্ভুক্তি এই সহযোগিতার কৌশলগত গুরুত্বকে স্পষ্ট করে। কারণ, যে কোনো দেশের সেনাবাহিনীর জন্যই এই বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
এই প্রতিবেদনের বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও রাশিয়া বা চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কোনো সাড়া দেয়নি।
তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইউক্রেন সংকটে তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে এবং এই প্রতিবেদনে করা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বেইজিং নিজেদের এই যুদ্ধে নিরপেক্ষ দাবি করে শান্তির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরছে।
ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও সামরিক নথির বরাত দিয়ে গত মাসে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, চীন গত নভেম্বরে প্রায় ২০০ রুশ সেনাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ইতোমধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন।
ক্রেমলিন এই প্রতিবেদনের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে পশ্চিমে প্রকাশিত ‘ভুল তথ্যের’ ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্র নীতিবিষয়ক প্রধান কায়া কালাস গত ১৫ জুন জানান, ব্রাসেলস নিজস্ব মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছে যে এই প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে এবং এখন এর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করা হচ্ছে। তবে বেইজিং তার এই বক্তব্যকে ‘মিথ্যা অপবাদ’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার কথা ভাবছে ইইউ
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকেই ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়াকে তাদের প্রধান নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখছে। একই সঙ্গে তারা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ইইউ-র প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের সঙ্গে মস্কোর ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।
২৭ সদস্যের এই জোটের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এখন প্রধান আলোচনার বিষয় হলো প্রথাগত বাণিজ্যিক সম্পর্কের কথা মাথায় রেখেও এই প্রশিক্ষণের প্রতিক্রিয়ায় কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন কি না। রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সহায়তার অভিযোগে ইইউ ইতোমধ্যে বেশ কিছু চীনা কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
ব্রাসেলসের একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, ইইউ-কে এখন চীনকে কেবল অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা বন্ধ করতে হবে। বরং কালাসের ভাষায়, চীন যে ‘রাশিয়ার যুদ্ধের অন্যতম প্রধান সহায়ক শক্তি’ হিসেবে কাজ করছে, সেদিকেই গুরুত্ব দিতে হবে।
সংবেদনশীল তথ্যের কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২ জুলাই স্বাক্ষরিত একটি চুক্তির ভিত্তিতেই এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়। এই চুক্তিতে রাশিয়ার মেজর জেনারেল রুস্তম খুসাইমভ এবং চীনের সিনিয়র কর্নেল সান দায়ুন স্বাক্ষর করেছিলেন।
তবে রাশিয়ার পার্লামেন্টের প্রতিরক্ষা কমিটির প্রধান আন্দ্রেই কার্তাপোলভ রুশ সংবাদমাধ্যম আরটিভিআই-কে বলেন, প্রশিক্ষণের এই খবরটি ‘সম্পূর্ণ আষাঢ়ে গল্প’। তিনি দাবি করেন, চীনের কাছ থেকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর নতুন কিছু শেখার নেই।
চীনের সামরিক অভিজ্ঞতার অভাব
ইউক্রেনে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে সরাসরি লড়াই করে রুশ বাহিনী ব্যাপক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। অন্যদিকে, বিশাল এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত সেনাবাহিনী থাকলেও কয়েক দশকে কোনো বড় যুদ্ধে জড়ানোর অভিজ্ঞতা নেই চীনের।
রয়টার্সের দেখা রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ সামরিক প্রতিবেদনে এই প্রশিক্ষণের ইতিবাচক ও নেতিবাচক—উভয় দিকই ফুটে উঠেছে। চীনের নানজিংয়ে হওয়া এক প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রতিবেদনে আধুনিক সরঞ্জাম, সিমুলেটর এবং প্রশিক্ষকদের তাত্ত্বিক জ্ঞানের প্রশংসা করা হলেও চীনের বাস্তব যুদ্ধ অভিজ্ঞতার অভাবের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যান্য নথিতে প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া তিন জেনারেলের নাম পাওয়া গেছে। রয়টার্সের দেখা একটি রুশ নথিতে কোর্সে অংশ নেওয়া প্রত্যেকের পদবি, জন্ম তারিখ ও নিরাপত্তার স্তরসহ বিস্তারিত তালিকা রয়েছে। রাশিয়ার স্থলবাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার-ইন-চিফ কর্নেল জেনারেল রুস্তম মুরাদভ রুশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন।
অন্যদিকে, পিএলএ-র রেডিওলজিক্যাল, কেমিক্যাল ও বায়োলজিক্যাল ডিফেন্স মিলিটারি একাডেমির প্রধান মেজর জেনারেল লি জিনসুন একটি কোর্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ওই তালিকায় দেখা যায়, রুশ মেজর জেনারেল ভিটালি গেরাসিমভ চীনের বেংবুতে আয়োজিত একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নিয়েছিলেন।