
বিশ্বকাপ ফুটবারে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার মধ্যে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ (আর্জেন্টিনার ভাষায় মালভিনাস) ইস্যুতে নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। আর্জেন্টিনা অভিযোগ করেছে, ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির একটি যুদ্ধজাহাজ তাদের জলসীমায় প্রবেশ করে ‘সামরিক অনুপ্রবেশ’ ঘটিয়েছে। যদিও যুক্তরাজ্য এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, জাহাজটির চলাচল ছিল নিয়মিত ও আন্তর্জাতিক আইনসম্মত।
আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানায়, ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ এইচএমএস মেডওয়ে আর্জেন্টিনার অধিক্ষেত্রভুক্ত সামুদ্রিক এলাকায় প্রবেশ করেছে, যা দেশটি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছে। বিবৃতিতে বলা হয়, মালভিনাস (ফকল্যান্ড) দ্বীপপুঞ্জ, সাউথ জর্জিয়া, সাউথ স্যান্ডউইচ দ্বীপপুঞ্জ এবং আশপাশের সামুদ্রিক এলাকার ওপর আর্জেন্টিনার সার্বভৌম অধিকার ইতিহাস, আইন এবং জাতীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত।
এইচএমএস মেডওয়ে মূলত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে মোতায়েন থাকা রয়্যাল নেভির একটি টহল জাহাজ, যা ওই অঞ্চলে মৎস্যসম্পদ রক্ষা ও নিরাপত্তা টহলের দায়িত্ব পালন করে। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আর্জেন্টিনা দীর্ঘদিন ধরে দ্বীপটির ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্ব দাবি করে আসছে। ১৯৮২ সালে এ দ্বীপকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ হলেও শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্য নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছে, এইচএমএস মেডওয়ের যাত্রাপথ সম্পর্কে আগেই আর্জেন্টিনা সরকারকে অবহিত করা হয়েছিল। সরকারের এক মুখপাত্র বলেন, ৫ থেকে ৮ জুলাইয়ের মধ্যে জাহাজটি চিলিতে একটি নিয়মিত লজিস্টিক সফর করেছে, যার উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক গবেষণা কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও রসদ পৌঁছে দেওয়া। তিনি আরও বলেন, জাহাজটি ফকল্যান্ড থেকে চিলিতে সবচেয়ে নিরাপদ ও বাস্তবসম্মত পথ ব্যবহার করেছে এবং পুরো যাত্রাই আন্তর্জাতিক আইন মেনে পরিচালিত হয়েছে।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারানোর পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের হাতে একটি ব্যানার দেখা যায়, যাতে লেখা ছিল, ‘ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনার’। বিষয়টি নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। ফিফার কাছে আর্জেন্টিনা দলের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি তুলেছেন কেউ কেউ, এমনকি দলটিকে ফাইনাল থেকে নিষিদ্ধ করার আহ্বানও জানিয়েছেন কিছু সমালোচক।
ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেছিলেন, তিনি চান না খেলাটি ফকল্যান্ড ইস্যুর রাজনৈতিক বিরোধে রূপ নিক। তবে ম্যাচ শেষে দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিক্টোরিয়া ভিয়াররুয়েল সামাজিক মাধ্যমে এক ভিডিও বার্তায় লেখেন, ‘এটি শুধু আরেকটি ম্যাচ ছিল না।’ ভিডিওতে আর্জেন্টিনার সেনাসদস্যদের দৃশ্যও দেখা যায়। এর আগে তিনি ইংল্যান্ডকে ‘দখলদার’ ও ‘ভূমি দখলকারী জলদস্যু’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি ব্যাডেনক বলেন, ‘ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ ব্রিটিশ ভূখণ্ড এবং কনজারভেটিভ পার্টি সবসময় এর সুরক্ষায় অটল থাকবে।’
ম্যাচ শেষে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামের বাইরে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং অন্তত তিনজনকে আটক করা হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছে। তবে মাঠের জয় উদ্যাপনের মধ্যেই ফকল্যান্ড ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে পুরোনো রাজনৈতিক বিরোধ আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে এসেছে।