আন্তর্জাতিক

অর্থের বিনিময়ে ট্রাম্পের পোস্ট আগে দেখার সুযোগ, দুর্নীতির অভিযোগে তীব্র সমালোচনা!

16080_20260715-trump-truth-social.jpeg

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মালিকানাধীন ট্রাম্প মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলজি গ্রুপ (টিএমটিজি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল–এ নতুন একটি অর্থের বিনিময়ে অগ্রাধিকারভিত্তিক সেবা চালুর ঘোষণা দিয়েছে। ‘ট্রুথ পিএসআই’ (Truth PSI) নামে এই সেবার মাধ্যমে অর্থ পরিশোধকারী গ্রাহকরা সাধারণ ব্যবহারকারীদের আগে গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট দেখতে পারবেন। সমালোচকদের অভিযোগ, এতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পোস্ট আগেভাগে দেখে ওয়াল স্ট্রিটের বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ারবাজার, বন্ড ও সুদের হার সংশ্লিষ্ট লেনদেন থেকে আর্থিক সুবিধা নিতে পারবে।

বৃহস্পতিবার এ পরিকল্পনা প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নৈতিকতা, স্বার্থের সংঘাত এবং ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ট্রুথ সোশ্যালে সবচেয়ে বেশি অনুসারী ট্রাম্পেরই এবং তিনি টিএমটিজির সবচেয়ে বড় শেয়ারধারী হওয়ায় তার পোস্ট থেকে কোম্পানির আয় বাড়লে তিনি সরাসরি আর্থিকভাবে লাভবান হবেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব ল–এর সরকারি নৈতিকতা ও স্বার্থের সংঘাতবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ক্যাথলিন ক্লার্ক এ পরিকল্পনাকে "স্পষ্ট দুর্নীতির" উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, একজন প্রেসিডেন্ট নিজের সরকারি কর্মকাণ্ডসংক্রান্ত তথ্য দ্রুত পাওয়ার সুযোগ বিক্রি করে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছেন, যা সরকারি ক্ষমতার অনৈতিক ব্যবহার।

যদিও ট্রাম্প মিডিয়া এ অভিযোগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। কোম্পানিটি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রশ্নেরও জবাব দেয়নি যে, প্রেসিডেন্টের নিজস্ব পোস্ট এই সেবার আওতার বাইরে রাখা হবে কি না।

কোম্পির প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ট্রুথ পিএসআই ব্যবহারকারীরা "সর্বোচ্চ গুরুত্বসম্পন্ন ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টগুলোর" পোস্ট অন্যদের আগে দেখতে পারবেন। বর্তমানে ট্রাম্পের অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২৯ লাখ। তার পরেই রয়েছেন বড় ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র এবং এরিক ট্রাম্প। তবে এই সেবার জন্য কত অর্থ নেওয়া হবে, তা এখনও জানানো হয়নি।

ট্রাম্প প্রায়ই ট্রুথ সোশ্যাল ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। ইরান যুদ্ধ, শুল্কনীতি এবং অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে তার পোস্ট অতীতে বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলেছে। গত বছর একদিনেই তিনি শতাধিক পোস্ট করেছিলেন, যখন তার অর্থনৈতিক নীতিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রে সম্ভাব্য মন্দার আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশেষ করে পররাষ্ট্রনীতি বা যুদ্ধসংক্রান্ত পোস্ট আগে থেকে জানার সুযোগ পেলে বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে অন্যদের তুলনায় উল্লেখযোগ্য সুবিধা পেতে পারে। এ কারণেই সমালোচকরা এই নতুন সেবাকে আর্থিক বাজারের জন্যও উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন।

২০২১ সালে ফেসবুক ও এক্স (সাবেক টুইটার) থেকে নিষিদ্ধ হওয়ার পর ট্রাম্প ট্রাম্প মিডিয়া প্রতিষ্ঠা করেন এবং ২০২২ সালে ট্রুথ সোশ্যাল চালু করেন। বর্তমানে তিনি একটি ট্রাস্টের মাধ্যমে কোম্পানির প্রায় ৫৩ শতাংশ শেয়ারের পরোক্ষ মালিক। কোম্পানিটির বর্তমান বাজারমূল্যের ভিত্তিতে তার এই শেয়ারের মূল্য প্রায় ১৪১ কোটি ডলার।

সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প মিডিয়ার শেয়ারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলেও প্রতিষ্ঠানটি নতুন নতুন ব্যবসায় প্রবেশের চেষ্টা করছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি, আর্থিক সেবা এবং পারমাণবিক ফিউশনসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের পাশাপাশি ট্রুথ পিএসআই সেবাকেও ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস হিসেবে দেখছে কোম্পানি।

ট্রাম্প মিডিয়ার নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কেভিন ম্যাকগার্ন বলেন, কোম্পানির নিজস্ব সম্পদ থেকে আয় বাড়ানোর কৌশলের অংশ হিসেবেই ট্রুথ পিএসআই চালু করা হচ্ছে। তার আশা, এটি প্রতিষ্ঠানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি এবং উল্লেখযোগ্য রাজস্বের উৎস হয়ে উঠবে। কোম্পানির দাবি, আগামী মাস থেকেই সেবাটি চালু হবে এবং ইতোমধ্যে কয়েকজন গ্রাহক এতে নিবন্ধন করেছেন।

তবে বিরোধী রাজনীতিক ও নৈতিকতা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের সরকারি কর্মকাণ্ডসংক্রান্ত তথ্য আগেভাগে দেখার সুযোগ অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করা গণতান্ত্রিক জবাবদিহি ও সরকারি নৈতিকতার জন্য গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

সর্বাধিক পঠিত


ভিডিও